একালের খ্যাতনামা সাংবাদিকদের সমবেত প্রচেষ্টায়, এই বইটি, একটি নিপীড়িত জাতির মুক্তি সংগ্রামের প্রতি মুহূর্তের অন্তরঙ্গ দলিল। বহু অজ্ঞাত তথ্যে সমৃদ্ধ। মনোযোগী বিশ্লেষণে দীপ্ত। এই বইয়ের শুরু সেই পটভূমিকায়, ভাষা ও সংস্কৃতির দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ যাকে রাঙিয়ে দিয়েছিল বিদ্রোহের প্রথম অগ্নিশিখায়। মুজিবের মুক্তি, ঢাকায় ফেরা, রমনার ময়দানে মুক্তি-পাগল জনতার সমুদ্রে এসে শেষ। মাঝখানে রয়েছে আয়ূবের আমলের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, নিবার্চনোত্তর পটভূমিকায় মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা, ২৫ মার্চের মধ্যরাতে পাকবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ, তারপর ভারতের মাটিতে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ঢল, মুক্তিফৌজের জন্ম, বিশ্বের দেশে দেশে একটি শোষিত জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে ভারতবর্ষের দূতিয়ালি এবং অবশেষে ভারত-পাক যুদ্ধ। মোট আটটি পর্ব। এই সব পর্বের পাশে পাশে সংযোজিত হয়েছে বহু পার্শ্ব উপাখ্যান। কাদের বাহিনী, মুজিব বাহিনী, মুজিব নগরের আম্রকুঞ্জে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা, বুদ্ধিজীবি হত্যার চক্রান্ত, পাক দূতাবাসে পদত্যাগ, মুক্তিলগ্নে মুজিবের পরিবার। এক কথায় বলা যেতে পারে, এই বই, পূর্ব-পাকিস্তান পদবী ঘুচিয়ে পূর্ব বাংলার ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে উত্তরণের পঁচিশ বছর ব্যাপী রক্তপাতময় সংগ্রামের ইতিহাস। সবার উপরে বইটি সম্মানিত হয়েছে দুই রাষ্ট্রের দুই প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায়। শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান স্বতঃস্ফূর্ত ভাষায় অভিনন্দিত করেছেন একদিকে দুরূহ অন্যদিকে দুঃসাহসী এই প্রচেষ্টাকে। সন্দেহ নেই, এই জাতীয় বইয়ের পরিকল্পনা আমাদের দেশে এই প্রথম। শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস বা দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতু রূপেই সমাদৃত না হয়ে যদি আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধ পাঠ-স্পৃহাকে ইতিহাসের প্রতি ক্রমাগত সচেতন ও অনুরাগী করে তুলতে সক্ষম হয়, সেখানেই হবে এই প্রকাশন-পরিকল্পনার যথার্থ সার্থকতা। বাঙালীর ইতিহাস নেই, এই খেদ বঙ্কিমচন্দ্রের। হঠাৎ কথাটি আমাদের মনে পড়ল, যখন এই বাংলার ওপারে আরেক বাংলা নিজেদের আগে বাঙালী, তারপর মুসলমান হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এক বুক রক্তের ভিতর। চোখের সামনে এবং যেন চোখের পলকে ওপারের বাঙালীকে তার নিজের ইতিহাস নিজের হাতে গড়ে নেবার এই যে নজীর-বিহীন দৃশ্যাবলী ঘটে গেল, সন্দেহ নেই, এই শতাব্দীতে তা আমাদের শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞতা। এমন মূল্যবান ইতিহাসের কোন মুদ্রিত দলিল বাংলা ভাষায় রচিত হবে না কেন, গোড়ায় এই ছিল আমাদের বিবেকের প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমে মনে এসেছিল অ্যালবাম। অর্থাৎ শুধুমাত্র উল্লেখযোগ্য আলোক-চিত্রের সংকলন। পরবর্তী সিদ্ধান্তে সংযোজিত হল বাক্য। অর্থাৎ ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। না। আরো গভীর পর্যালোচনায় স্থির হল ছবি ও লেখার যৌথ অভিযান। তার ফলে এল পর্ব বিন্যাস। মোট আটটি পর্বে বিভক্ত করা হল বইটিকে। এর মধ্যে সপ্তম পর্বটি হল ভারত-পাক যুদ্ধ। এই পর্বটিকে আবার ভাগ করা হয়েছে বহু খণ্ড অধ্যায়ে। প্রথমে রয়েছে যুদ্ধের প্রাথমিক পরিকল্পনার বিস্তৃত বিবরণ। তারপর যুদ্ধকালীন প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র দিনের জীবন্ত ছবি। চতুর্থ পর্বের বিষয়, শরণার্থী। এই অধ্যায়টিতে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ীই আমরা লেখার চেয়ে জোর দিয়েছি ছবিতে। তার কারণ শরণার্থী বিষয়ক আলোকচিত্রগুলি পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাদের চোখে এল, প্রতিটি ছবি তার নিজের কথা নিজেই বলে চলেছে অব্যক্ত বেদনায়। কাহিনী নিষ্প্রয়োজন। প্রাথমিক পরিকল্পনার পালা শেষ। অতঃপর উপযুক্ত সাংবাদিকদের উপর ন্যস্ত করা হল প্রতিটি পর্ব রচনার দায়িত্ব। সদিচ্ছার তুলনায় আমাদের সামর্থ্য সংক্ষিপ্ত। তবুও নিয়ত চেষ্টায় আমরা পৌঁছতে চেয়েছি এক সুবিন্যস্ত সার্থকতার দিকে। বাংলা পুস্তক প্রকাশনার ক্ষেত্রে বইটি যদি নতুন স্বাদ ও নতুনতর ভঙ্গীর উদ্ভাবক হিসেবে সম্মানিত হয়, সেইটিই হবে আমাদের সকল সংকল্প ও শ্রমের একমাত্র ঐকান্তিক মূল্য।