মনে হয়, আকরিক অনুভূতিগুলি আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে চাইছে।—পাঁচ বছর আগে একটি প্রবন্ধের উপসংহারে লিখেছিলেন অশোক মিত্র। প্রতিবেশী একটি দেশে কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনী সাফল্যে কেন চারপাশে যথেষ্ট উদ্দীপনা নেই, এই ছিল তাঁর ক্ষুব্ধ বিস্ময়ের কারণ। গত কয়েক বছরে লেখা প্রবন্ধগুলিতে নানা প্রসঙ্গে নানাভাবে ফিরে আসে ক্ষোভ, বিস্ময়, বেদনা। সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য, গান, নাটক, রাজনীতি, অর্থনীতির বহুধাবিস্তৃত পরিসরে তাঁর বিদগ্ধ ভাবনায় সমৃদ্ধ লেখাগুলিতে স্বাতন্ত্র্যের যে অভিজ্ঞানটি অমোঘ দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা ওই ‘আকরিক অনুভূতি’। বিপুল আর্থিক বৈষম্য এবং বিপুলতর সামাজিক অবক্ষয় তাঁকে প্রতিনিয়ত তীব্র বেদনায় আর্ত করে, কিন্তু এই অদ্ভুত আঁধারেও, সারাজীবনের লালিত সমাজবিপ্লবের স্বপ্নগুলিকে ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হতে দেখেও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও শুভনাস্তিক হতে পারেন না, বলতে পারেন না, ‘কিছু হবে না, কিছু হওয়ার নয়’। মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ সেই শৌখিন আলস্যের কোনও স্থান, যথারীতি, এই লেখাগুলিতেও নেই। বাংলা ভাষার প্রতি শহরের উচ্চবিত্ত বাঙালির লজ্জাকর এবং ন্যক্করজনক অবজ্ঞায় শিহরিত হয়ে তিনি বারংবার তীব্র তিরস্কার করেন, কিন্তু হাল ছাড়েন না, কখনও বইমেলাগুলিতে প্রাথমিক শিক্ষার শিবির বসিয়ে বাংলা পড়ার প্রসার ঘটানোর পরামর্শ দেন, কখনও বা স্বপ্ন দেখেন, চল্লিশের দশকের ‘এক পয়সায় একটি’ কাব্যগ্রন্থমালা নতুন করে প্রকাশ করা যায় না? এবং চারপাশের ঘটনাচক্র অবলোকন করে নিক্ষেপ করেন তীব্র আবেদন: দোহাই, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আমাকে সামিল করবেন না।