ব্যক্তি জীবনের, বিশেষত মধ্যবিত্তের নানাবিধ বোধ ও অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে রচিত অসংখ্য সৃজন-বৈচিত্র্যে বাংলা ছোটগল্পের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি আবহমান গ্রাম বাংলার আধারে, মাটির সাথে মিলেমিশে জড়িয়ে থাকে সমষ্টির সঙ্গে এবং টিকে থাকার সংগ্রামে ক্ষুধা ও ক্ষোভে দেশকালের খাঁচায় আবর্তিত হয়ে ওঠে যে সমষ্টিগত জীবন, বাংলা ছোটগল্পে তার মর্মস্পর্শী প্রতিফলন ঘটিয়ে সাড়া জাগিয়েছিলেন এ কালের বিশিষ্ট গল্পকার মঞ্জু সরকার। ১৯৮২-তে প্রথম গল্পগ্রন্থ অবিনাশী আয়োজন প্রকাশের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করেছেন নিজের যাত্রাপথ ও সাহিত্যিক-অঙ্গীকার। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের ছয়টি গল্পগ্রন্থ। এসব বই থেকে বাছাই করা বারটি গল্পের সংকলন মঙ্গাকালের মানুষ। উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যপীড়িত জনপদে মঙ্গা হলো আকাল বা দুর্ভিক্ষ। এই শব্দের ব্যপ্তি ও ভয়াবহতার কারণে দেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে এখনও লক্ষ কোটি মানুষ। উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিত হয় দরিদ্রতম একটি দেশ হিসেবে। এই দারিদ্র্যের ভয়ঙ্কর প্রকাশ নিয়ে যখন মঙ্গা আসে, তার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে রাজনীতি ও সংবাদপত্র হয়ে ওঠে সরব। কিন্তু এই সামাজিক বাস্তবতা কথাসাহিত্যে মানবিক ও শৈল্পিক মর্যাদা পেয়েছে যাঁদের কলমে, মঞ্জু সরকার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মঙ্গাকালের মানুষ তাই পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতার দলিল যেমন, তেমনি তা হয়ে উঠেছে আবহমান গ্রাম বাংলার বঞ্চিত, খেটে-খাওয়া ও খেতে-না-পাওয়া মানুষের চিরকালীন মর্মস্পর্শী গল্পের একটি সংকলন গ্রন্থে।