আঠারোশো ছিয়াত্তর সালেই কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর একটি বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ তখনও মার্কস জীবিত এবং তাঁর ও এঙ্গেলসের যৌথ-রচনা ইস্তাহারের (১৮৪৮) বয়স মাত্র আটত্রিশ। এত অল্পসময়ের মধ্যেই তখনকার বাঙালি সমাজের একাংশ যে এই সমাজদর্শনের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলেন, তার মূলে ছিল নবজাগরণের উন্মেষলগ্নের অভিঘাত। অন্যদিক থেকে, রেনেসাঁস-এর মানবিক মূল্যবোধ আর আঠারো শতকের যুক্তিবাদ মার্কসীয় সমাজদর্শনের উত্তরাধিকার। ফলে বুদ্ধির চর্চায় আগ্রহী বাঙালি সেই নতুন ও যুগান্তকারী তত্ত্ব সম্পর্কে কৌতূহলী হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। সাম্যবাদী তত্ত্ব সম্পর্কে বাঙালির এই আগ্রহ এরপর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের ঐতিহাসিক মুহূর্তে সারা পৃথিবী কেঁপে ওঠে। সেই ভূকম্পনের রেশ বাঙালি যেভাবে অনুভব করেছে, তার ইতিহাস দীর্ঘ এবং বহুধাবিস্তৃত। এখানে উল্লেখ করতেই হবে, রুশ বিপ্লবের বহু আগে থেকেই রাশিয়া সম্পর্কে বাঙালি অনেক কিছু জানত। যেমন ১৮১৮ সালে শ্রীরামপুর মিশনের ‘দিগদর্শন’ পত্রিকায় ‘রুষিয়া’ শীর্ষক একটি রচনা প্রকাশিত হয়। যদি ১৮১৮-কে শুরুর বছর ধরা হয় তা হলে ১৯১৭-তে তার চরম পরিণতি। রুশ বিপ্লবের কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালির সঙ্গে কমিউনিস্ট ভাবধারা, দর্শন ও সংগঠনের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বেশ কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক রাশিয়ায় যান। এদিকে ১৯২৫ সালে কানপুরে একটি প্রতিনিধি সম্মেলনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি তখন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণায় উত্তাল সারা দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নানা গণ আন্দোলন, মহামন্বন্তর ও দেশভাগের পর্ব পেরিয়ে অবশেষে আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তি। রুশ বিপ্লব (১৯১৭) থেকে ভারতের স্বাধীনতা (১৯৪৭) এই তিরিশ বছরে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা যথেষ্ট সংখ্যক বই, প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা লিখেছেন সাম্যবাদ এবং রুশবিপ্লব নিয়ে। সময়ের দিক থেকে খুব বেশি না হলেও এই ত্রিশ বছরে বাঙালির সাম্যবাদ চর্চার যে-ইতিবৃত্ত, তার সঙ্গে আজকের পাঠকদের পরিচয় অত্যন্ত কম। নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা এবং বহু ক্ষেত্রে জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে সেই ইতিহাস এই গ্রন্থে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলা ভাষায় মার্কসীয় তত্ত্বের সহজ ব্যাখ্যা, সোভিয়েত সমাজ সম্পর্কে নানা ফিচার ও খবর, কয়েকটি গণ আন্দোলনের বিবরণ এবং উপন্যাসে কাব্যে নাটকে গানে কবিতায় অর্থাৎ সাহিত্যের নানা ধারায় মার্কসীয় দর্শনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের কিছু নমুনা এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। সমসময়ে প্রকাশিত কিছু স্বল্পস্থায়ী এবং দুষ্প্রাপ্য পত্রপত্রিকা এবং গ্রন্থ থেকে রচনাগুলি সংগৃহীত। হয়তো চিন্তার ক্রমবিবর্তনের কোনও স্পষ্ট রেখা বা সুনির্দিষ্ট ঝোঁক এই সময়ের নানা পাঁচ মিশালি রচনায় সহজে আবিষ্কার করা যাবে না। কিন্তু ওই তিরিশ বছরের মধ্যে সমস্ত ধরনের লেখা মিলিয়ে যে-রাজনৈতিক সাহিত্য বলয় তৈরি হয়েছিল, তাকে না জানলে বুদ্ধিজীবী বাঙালির সামগ্রিক পরিচয়ও আমাদের কাছে অস্পষ্ট থেকে যাবে। এই গ্রন্থের সংকলকরা সেই জরুরি কাজটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। বাঙালির সাম্যবাদ চর্চার একটি আনুপূর্বিক কোষগ্রন্থ হিসেবে এই বইয়ের প্রয়োজনীয়তা কখনও ফুরোবে না।