দেহ-আশ্রয়ী জ্ঞান বিস্তৃত হয়েছে সৃষ্টি, প্রকৃতি ও প্রাণের রহস্যমােচনের দিকে। প্রজ্ঞা ও উপায়কে যুক্ত করে মুক্তি ও আনন্দকে পেতে সহজসত্তা অর্জন করতে চেয়েছেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ। নাথযােগীরা যােগবিভূতির কল্যাণে কীভাবে শুদ্ধ দেহ লাভ করে। অমরত্বের পথ পাওয়া যায় তার তত্ত্ব ও পদ্ধতি বের করতে সচেষ্ট হয়েছেন। মরমী সূফী সাধকগণ পরম ভাবের ভেতর নিজের সত্তার স্থায়িত্ব কীভাবে দেয়া যায়: তার তত্ত্ব ও পদ্ধতি নিয়ে ভেবেছেন। ভক্তি আশ্রয়ী বৈষ্ণবগণ পরমের প্রকাশকে খুঁজেছেন মানব সম্পর্কের ভেতর, আবার মানব অস্তিত্বকেও উপলদ্ধি করতে চেয়েছেন তূরীয় সত্তার ভেতর। বাউল সাধক পরম ভাবকে প্রতিষ্ঠা দিতে এবং সেই ভাবের বিকাশ দেখতে চেয়েছেন। তারা পরমকে মানব দেহের সীমায় এনে সাধনার কেন্দ্রীয় বিষয় করে তুলেছেন মানুষকেই। এইসব সাধক সম্প্রদায়ের অন্বেষণ আমাদের দেখিয়েছে বাঁচবার জন্য ভাবনা ও বিশ্বাসের নানা দিগন্ত। এ এমনই এক বিস্তার যা ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রিয়ের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেয়। এ থেকে আমাদের নির্মোহ ও বৈচারিক বিবেচনা নিজেদের জন্য সত্যপথ বেছে নিতে সাহায্য করে। ইউরােপীয় উপনিবেশ তাদের শাসক সত্তার বৈধতা দিতে আমাদেরকে বুঝিয়েছে, আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলাের নাকি কোনাে পরিণতি বা কোনাে ধারাক্রম নাই। এ বক্তব্য যে কতটা অসার ও মিথ্যা তা চোখের উপর থেকে উপনিবেশের চশমা খুলে ফেলে নিজেদের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে ভালাে করেই বুঝতে পারা যায়। উপনিবেশপূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ভেতর দানা বেধে আছে জাতিসমূহের যে ধর্মবােধ ও ভাবুকতা তাকে কর্ষণ করে, তার সঙ্গে আত্মপরিচয়কে যুক্ত করেই কেবল নিজের বিশ্বাসের ভূমিতে দাড়িয়ে ঔপনিবেশিক ক্ষতিকে মােচন করা যেতে পারে।