আদতে ছিল আদিম জীবিকা। রাজারাজড়াদের কবলে পড়ে হল প্রমোদ-বিলাস। সাহেবদের পরিশীলিত ‘স্পোর্ট’। সেই ‘স্পোর্ট’ প্রলুব্ধ করল বাঙালিবাবুদের। সাহেবি কেতায় নিজেদের মুড়ে নিতে হলে বিলেতিয়ানার সঙ্গে একটু বীরত্বের মিশেল থাকা জরুরি। ‘এফিমিনেট’ নেটিভ হয়ে থাকার জ্বালা সয় না প্রাণে। অতএব, ব্রিটিশ রাজপুরুষদের দেখাদেখি সামন্তরাজা, জমিদার এবং বাবুবাঙালিগণ বিগ গেম শিকারের নেশায় বুঁদ। এই দেশি বন্দুকবাজদের জঙ্গলযাত্রার তাগিদের পেছনে মোক্ষম সব কৈফিয়তও ছিল বিলক্ষণ মজুত। ঔপনিবেশিক শিকারক্রীড়ার ইতিহাসে শৌখিন বাঙালিদের ভূমিকা যথেষ্ট দীর্ঘ। একশো বছর তো বটেই। তবে গ্রাম্য শিকারিদের আখ্যানকে সরিয়ে রেখে এদের কারও কাহিনি-কীর্তন অবান্তর। কারণ, প্রান্তবাসী সমাজের শিকারদক্ষতা ও অরণ্য-অভিজ্ঞানের ওপর ভরসা রেখেই স্বদেশি এবং বিদেশি শিকারিদের যাবতীয় আরণ্য-আয়োজন। অথচ তাদের অভিযানে এই নিম্নবর্গীয়রা যতটা অপরিহার্য, উপেক্ষিতও ততটাই। পুরোটাই যে এই উপেক্ষিত সমাজ মুখ বুজে সয়ে যেত, তেমন নয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরও ছিল সপাটে প্রতিবাদের নিজস্ব ভঙ্গি। ছেড়ে কথা কইবার মানুষ তারা সবাই ছিল না। নিজেদের কলমে শিকারবৃত্তান্ত পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেবার দায় কিংবা ক্ষমতা না-থাকলেও নিজেদের বয়ানে সেই সব অ্যাডভেঞ্চারের দস্তাবেজ রেখে গেছেন কেউ, কেউ সেসবের তোয়াক্কা করেননি। ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গীয় শিকারিদের ভূমিকা, অবস্থান ও প্রাসঙ্গিকতার তত্ত্বতালাশই এই বইয়ের উপজীব্য। বস্তুত, এই বই বঙ্গের শিকারিদের একটি ত্রিমাত্রিক আখ্যান নির্মাণের প্রয়াস।