“আমি মনে করি, কবিতার অন্যতম গুণ স্মরণীয় হয়ে থাকা”—একবার লিখেছিলেন অরুণকুমার সরকার। এই উক্তি যে নিতান্ত কথার কথা নয়, আজ তার জ্যান্ত উদাহরণ তাঁর নিজেরই কবিতা। দুটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ, তাও দীর্ঘকাল যাবৎ বাজার থেকে উধাও, তবু রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিকুলের মধ্যে অরুণকুমার সরকারই সম্ভবত লিখে গেছেন সবথেকে স্মরণীয় পঙক্তিমালা। ‘পুরনো বন্ধুরা যত স্মৃতির গম্বুজ হয়ে আছে’, ‘বৃষ্টিভেজা বাড়ির মতো রহস্যময়/তোমার হাতে আছে আমার একটু সময়’, ‘প্রতিধ্বনি ঘোরে কক্ষে কক্ষে/ কে আছ? কেউ আছ? কেউ কি নেই হে’, ‘যদি মরে যাই/ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই', ‘যৌবন যায়। যৌবনবেদনা যে/যায় না’, ‘শুধু প্রেম নয়, কিছু ঘৃণা রেখো মনে’, ‘ভালোবাসা, তুমি সুদূর শঙ্খচিল’, ‘রেখেছি তমালের গোপন ডালে/যুবতী শ্রীরাধার তনু’, ‘সিন্দুক নেই, স্বর্ণ আনিনি/এনেছি ভিক্ষালব্ধ ধান্য’, ‘সব কবিতাই পুনর্লিখিত কবিতা’—অরুণকুমার সরকারের নানান কবিতায় ছড়িয়ে-থাকা ‘গড়নে অপরূপ ভাবনে মুগ্ধ’ এমন অজস্র কাব্যপঙক্তি সমকালে যেমন ফিরেছে, আজও তেমনই পাঠকের মুখে-মুখে ফেরে।এহেন অরুণকুমার সরকারেরই যাবতীয় কবিতা নিয়ে অখণ্ড এই সংগ্রহ। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘দূরের আকাশ’ ও ‘যাও, উত্তরের হাওয়া’ ছাড়াও, এ-যাবৎকাল গ্রন্থভুক্ত হয়নি—এমন-কি ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’তেও নয়—এমন সমূহ কবিতা এই সংকলনে। এর বাইরে, মূলত ছোটদের জন্য যেসব কবিতা লিখেছিলেন অরুণকুমার সরকার, করেছিলেন বিদেশি কবিতার বাংলা যে-তর্জমা, তাও এই বইতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে।এই সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ, ‘কবি অরুণকুমার’ শিরনামায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি দীর্ঘ বিশ্লেষক আলোচনা, যা একাধারে মুখবন্ধ এবং অরুণকুমার সরকারের কবিতার গূঢ় অভ্যন্তরে প্রবেশের চাবিকাঠি।সব মিলিয়ে, আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি জরুরি, মূল্যবান ও দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত সংগ্রহের সংযোজন অরুণকুমার সরকারের এই ‘কবিতাসমগ্র'।