বঙ্কিমচন্দ্রের একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণিক জীবনীগ্রন্থের অভাব দীর্ঘকালযাবৎ অনুভূত। বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাবের পর দেড় শো বছর কেটে গেছে, তাঁর তিরোভাব-তিথিও শতবর্ষ স্পর্শের মুখে। এই সুদীর্ঘ সময়পর্বের মধ্যে তাঁর একাধিক সার্থক জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়াই ছিল স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। কিন্তু তা যে হল না, এ শুধু আমাদের দুর্ভাগ্যেরই নয়, জাতীয় কর্তব্যচ্যুতিরও পরিচায়ক। বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর আঠারো বছর পরে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শচীশচন্দ্র ‘বুকের ভিতর এক অভূতপূর্ব দৈবশক্তি অনুভব’ করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ‘স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন-চরিত’ নামে যে-জীবনী গ্রন্থটি রচনা করেন, তা প্রথম হিসেবে নিশ্চিত স্মরণীয়। কিন্তু নিরাবেগ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রজ্ঞার আলোয় বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ মূর্তিটি সেখানে দেখা ও দেখানো হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মের সার্ধ-শতবর্ষে এই জীবনীগ্রন্থের পুনর্মুদ্রণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সম্পাদকীয় নিবেদনে অধ্যাপক অলোক রায় মন্তব্য করেছিলেন, “প্রথম সংস্করণ গ্রন্থ প্রকাশের সাতাত্তর বছর পরে সার্থকতর বা অধিকতর নির্ভরযোগ্য বঙ্কিমজীবনী আজও রচিত হয়নি।” হয়নি যে, লক্ষ করেছিলেন অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশীও। ‘বঙ্কিম সরণী’ গ্রন্থের সূচনাতে তাঁর আক্ষেপ— “বঙ্কিমচন্দ্রের যোগ্য জীবনী এ-পর্যন্ত লিখিত হল না। অবশ্য জীবনী নামে অনেক গ্রন্থ আছে, তাদের মূল্য অস্বীকার না করেও বলা চলে যে, কোনখানিই বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা ও জীবনের যোগ্য নয়।” অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের এই বঙ্কিমজীবনী সেই আক্ষেপ ও অভাবকেই দূর করবে। তিরিশ বছর ধরে একাগ্রভাবে বঙ্কিম-গবেষণায় নিযুক্ত থেকে বঙ্কিমবিশেষজ্ঞ রূপে নিজেকে যিনি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, একমাত্র তাঁর পক্ষেই বুঝি সম্ভবপর ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনপঞ্জীর, জীবন-সাধনার ও মনোজগতের এমন এক ধারাবাহিক, তথ্যসমৃদ্ধ ও যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণে শাণিত গ্রন্থ রচনা করা। সাহিত্যসম্রাটের জীবন ও প্রতিভার প্রকৃত স্বরূপটি বুঝে নিতে লেখকের তিন দশকের চিন্তা, ভাবনা, গবেষণা, অধ্যয়ন ও উপলব্ধির ফসল এই গ্রন্থটি হয়ে থাকবে অপরিহার্য ও অমূল্য এক আকরগ্রন্থ।