ভারতীয় কলাসংস্কৃতির অন্যতম বাহন নৃত্য বা নাচ। ভরতের নাট্যশাস্ত্রে নৃত্যসম্পর্কিত আলোচনা এক স্বতন্ত্র চর্চার বিষয়। আনন্দদান ও আনন্দলাভের ক্ষেত্রে নৃত্যের অবদান অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ নৃত্যের এই ভূমিকাকে অন্তরের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। একটা সময় এসেছিল যখন নাচকে ভারতের শিক্ষিত জনমানস নিচু দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। নিছক মনোরঞ্জন ছাড়া এর শিল্পকৃতি সম্পর্কে তাঁরা কোনও শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করতেন না। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ নৃত্যকলাকে শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে। এখানকার শিক্ষার আদর্শ সম্পর্কে তিনি বলতেন : ‘একদিন শান্তিনিকেতনে আমি যে শিক্ষাদানের ব্রত নিয়েছিলুম তার সৃষ্টিক্ষেত্র ছিল বিধাতার কার্যক্ষেত্রে—আহ্বান করেছিলুম এখানকার জলস্থল আকাশের সহযোগিতা। জ্ঞানসাধনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলুম আনন্দের বেদীতে।’ এই আনন্দবেদীতে সংগীত এবং নাটকের সঙ্গে কবি নৃত্যকেও আহ্বান জানিয়েছিলেন অকুণ্ঠচিত্তে। একসময় শান্তিনিকেতনের বিশ্ববিদ্যাপ্রাঙ্গণে এসে মিলেছিল মণিপুরী, কথাকলি, কথক প্রভৃতি ভারতের বিভিন্ন ধ্রুপদী নৃত্য; জাভা, বলি, জাপান ইত্যাদি প্রাচ্যদেশীয় নৃত্যধারা; এবং ব্যালে প্রভৃতি ইউরোপীয় নৃত্যাভিনয়। আবার এদের সম্মিলনে সৃষ্টি হয়েছিল একটি স্বতন্ত্র রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা। রবীন্দ্রনাথ যে-নৃত্যআন্দোলন শুরু করেছিলেন, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন শান্তিদেব ঘোষ। কবি স্বয়ং তাঁকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজেও দেশ-বিদেশ ঘুরে শিখেছেন নানা নৃত্যকলা। সঞ্চয় করেছেন বহু অভিজ্ঞতা। এই গ্রন্থ প্রবীণ শিল্পী-লেখকের সেই শিক্ষা-সঞ্চয়-অভিজ্ঞতার লিপিরূপ।